নো ম্যানস ল্যান্ড: মোদক রেঞ্জের বিভীষিকা

Comments

মেঘালোকের গোলকধাঁধায়: পথ হারানোর শুরু

বেলা তিনটে বেজে গেছে, আমরা সম্পূর্ণ পথভ্রষ্ট। চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা ঘন জঙ্গল আর মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনার নেই। আকাশের মুখ ভার, মেঘের ঘনঘটা আর গাছের পাতায় বৃষ্টির অবিরাম পতনে এক অদ্ভুত হাহাকার তৈরি হয়েছে। আমরা হাঁটছি, কিন্তু কোথায় যাচ্ছি জানি না। প্রতিটি কদম যেন শরীরের শেষ শক্তিটুকু শুষে নিচ্ছে। অবসাদে ভেঙে আসছে প্রতিটা হাড়। সঙ্গে আনা শেষ পানির বোতলটা আধঘণ্টা আগেই শূন্য হয়ে গেছে। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে সবার। পাহাড়ের গহিনে তৃষ্ণা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

মেঘে ঢাকা জোত্লং।

আমাদের সাথে কোনো গাইড নেই, অভিজ্ঞতার দম্ভে নিজেরাই জঙ্গল কেটে পথ তৈরি করে এগোচ্ছি। ভরসা এখন কেবল বুনো কচি বাঁশ; ঝাড় থেকে কচি কঞ্চি ভেঙে চিপে তা থেকে যে সামান্য তিতা রস বের হয়, তা দিয়েই জিভ ভেজানোর বৃথা চেষ্টা করছি আমরা ছয়জন। একেকটি ঢোক গিলছি আর মনে হচ্ছে জীবনের স্বাদ বুঝি এমনই লোনা আর তিতা।

গাছখেকো দানব ও বিপন্ন অরণ্য

যাবার পথে বনের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ আসছিল। এই দুর্গম অরণ্যে মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন, অথচ এখানে নিয়মিত গাছ কাটা হচ্ছে। বনের গভীরেই চোখে পড়ল ‘গাছখেকোদের’ আস্তানা। বাঁশ আর পলিথিনের ঘরে থাকা এই শ্রমিকেরা চকরিয়া, লামা কিংবা আলীকদম থেকে এসে এখানে আস্তানা গেড়েছে। তাদের লক্ষ্য বনের আদিম সম্পদ।

বিস্তৃণ অরণ্য, দুরে চিম্বুক ও মিরিঞ্জা রেঞ্জের পাহাড়।

বামে মিয়ানমার আর ডানে বাংলাদেশ,এই দুই ভূখণ্ডকে বিভক্ত করেছে মোদক রেঞ্জের সুউচ্চ পর্বতশৈলী। দেশের শীর্ষ দশটি চূড়ার চারটিই এই মোদক রেঞ্জে অবস্থিত এবং সব কটিই থানচি উপজেলাজুড়ে। সাকা হাফং, জোত্লং, যোগী হাফং ও হাজরা হাফং যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ এবং নবম (সম্ভাব্য)। কিন্তু সুউচ্চ এই পাহাড়গুলোর গহিন অরণ্য আজ আর নিরাপদ নয়। কান পাতলেই শোনা যায় বৈদ্যুতিক করাতের কর্কশ শব্দ। দানবের চোখ পড়েছে বনের মাদার ট্রিগুলোর ওপর। বন ধ্বংসের এই খেলায় বিপন্ন হচ্ছে বুনো প্রাণীরা; নিয়মিত শিকারীর ফাঁস ঝুলছে তাদের গলায়।

জোত্লং এর পথে অপূর্ব ঝিরি।

এই আদিম অরণ্যের বুক চিরে শুধু করাতের শব্দই নয়, আদিবাসীদের শিকারের দৃশ্যও আমাদের চোখে পড়ল। এই অঞ্চলে নিয়মিত শিকার চলে। আমরা সচক্ষে দেখলাম তাদের শিকার করে আনা দানবীয় এক কিং কোবরা আর একটি মায়া হরিণ। অরণ্যের রাজা কোবরা আর মায়াবী চোখের হরিণটি এখন নিথর, তারা আজ স্রেফ ভোজের সামগ্রী।

শিকার করে আনা মায়া হরিণ।

বনের এই গহিন অরণ্য ছিল বাংলাদেশের শেষ কিছু নিরাপদ অভয়ারণ্যের একটি, কিন্তু এখন তা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভালুক, মায়া হরিণ, কিং কোবরা আর রাজ ধনেশের শেষ আশ্রয়ের ওপর আজ লোভী মানুষের থাবা।

মৃত্যুর ঘ্রাণ: বুনো ভালুকের পদচিহ্ন

এক অন্ধকারাচ্ছন্ন বাঁকে পৌঁছাতেই টের পেলাম—আমরা এখানে একা নই। কড়া, তীব্র ভটকা একটা বন্য গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারল। খুব কাছাকাছি কোথাও একটা বিশালকার ভালুক আছে। মাটিতে তাকাতেই বুকটা হিম হয়ে এল; একদম টাটকা বিষ্ঠা আর পাথুরে কাদার ওপর প্রকট পায়ের ছাপ।

 ঘন বাঁশ ঝোপ ঠেলে ঠেলে পথ চলছি।

এই গহিন মোদক রেঞ্জের জঙ্গলে দশ ফুট দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না, শুধু অনুভব করছি কোনো এক অদৃশ্য হিংস্র জোড়া চোখ আমাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। হয়তো আমরা সংখ্যায় ছয়জন বলে সে সরাসরি আক্রমণ করার সাহস পাচ্ছে না, কিন্তু ভয় আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। আমরা একে অপরের শরীর ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটছি, যেন সামান্য বিচ্ছেদ মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। সঙ্গীদের হারানোর ভয়টা এখন খোদ মৃত্যুর চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিজের সাথে যুদ্ধ: পাহাড় আর ফিরব না

আমরা ঠিক নো ম্যানস ল্যান্ডের ওপর দিয়ে হাঁটছি। যত এগোচ্ছি, জঙ্গল যেন তত বেশি আদিম আর হিংস্র হয়ে উঠছে। যেখানে ঝিরি পথটা শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে আমরা ভুল করে বাম দিক থেকে অনেকখানি বিচ্যুত হয়ে পড়েছি। এই ভুল পথ আমাদের ক্রমশ লোকালয় থেকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এমন দৃশ্য দেখতেই বারে বারে ফিরি, জোত্লং এর পথে।

চারদিকে অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির; কিন্তু সেই ডাক আজ সুরেলা মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে কোনো আসন্ন বিপদের আর্তনাদ। মাঝদুপুরেও চারদিক নিশীথিনীর মতো অন্ধকার। মেঘে ঢাকা পাহাড়গুলো যেন দানবের মতো আমাদের গিলে খেতে ওত পেতে আছে।

বৃষ্টি নেমেছে জোত্লং জুড়ে।

নিজের মনেই নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি—কেন এই পাহাড়ের নেশায় বারবার ছুটে আসা? পথ ভুল করা যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাপাপ। নিজের ভেতর এক প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। মনে মনে কঠিন প্রতিজ্ঞা করছি, এবার যদি কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারি, তবে আর কোনোদিন পাহাড়ের ছায়াও মাড়াব না।

গন্তব্য যখন অনিশ্চিত: এক যন্ত্রণাময় অবতরণ

গাইড ছাড়া আসার সেই দুঃসাহসের মাসুল এখন কড়ায়-গন্ডায় দিচ্ছি আমরা। জঙ্গল কাটতে গিয়ে আমাদের সবার হাত-পা ক্ষতবিক্ষত। বৃষ্টির জল সেই ক্ষতে লেগে চড়চড় করছে। ভিজে সোপসোপে শরীরে ঠান্ডা বাতাসের কামড় আর প্রচণ্ড তৃষ্ণায় গলা পুরোপুরি কাঠ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে সাড়ে ছয় ঘণ্টা অবিরাম হেঁটেছি। এই সময়ে অনায়াসেই ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম পৌঁছে যাওয়া যায়, অথচ আমরা এখানে এক মরণফাঁদে নিথর হয়ে আটকে আছি।

দিনেও যেন নিশীথিনীর অন্ধকার।

গতকালই পাহাড়ের পাথরে লেগে আমার ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নখটা গোড়া থেকে উপড়ে গেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে যখন ব্যথার ঢেউ আছড়ে পড়ছে মস্তিষ্কে, তখন থামার উপায় নেই। সঙ্গীদের মুখগুলো ফ্যাকাশে, চোখেমুখে একরাশ মৃত্যুভয়। ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ মরুভূমি।

 

হাঁটতে হাঁটতে অবচেতন মনেই বাড়ির খাবারের তালিকা করছি—যদি কোনোমতে ফিরতে পারি, তবে ঢাকা গিয়েই প্রথম মায়ের হাতের এক থালা ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর কষা গরুর মাংস খাব। সাথে এক্সট্রা চিজ দেওয়া প্রিয় পাস্তা আর এক গ্লাস বরফ শীতল কোক।

অফলাইন ম্যাপ ও জীবনের স্পন্দন

মোবাইলের অফলাইন ম্যাপ এখন আমাদের একমাত্র জীবনদায়ী ভরসা। আমাদের দলপতি তৌফিক তমালের অস্থিরতাটা বাইরে প্রকাশ করছেন না, কিন্তু তার কপালে চিন্তার রেখাগুলো গভীরতর হচ্ছে। ম্যাপটা বারবার জুম করে তিনি আমাদের বাম দিকে নিচে নামার সংকেত দিচ্ছেন।

নিস্তব্ধ চারদিক, শুধু মাটিতে জমাট বাঁধা শুকনো পাতার চাদর মাড়ানোর মচমচ শব্দ। এটি টাইগার জোঁকের স্বর্গরাজ্য। বৃষ্টির আর্দ্রতায় জোঁকগুলো যেন একেকটা ক্ষুধার্ত তীরের মতো আমাদের গায়ের ওপর লাফিয়ে পড়ার জন্য তৈরি। আজ নভেম্বরের ১ তারিখ। ঋতু অনুযায়ী পাহাড় এখন শুষ্ক থাকার কথা, কিন্তু এখানে বর্ষার এক চিরস্থায়ী শাসন চলছে।

হঠাৎ অফলাইন ম্যাপে দলপতির চোখে একটা আশার ঝিলিক দেখা দিল। আমরা কাঙ্ক্ষিত রুটের খুব কাছাকাছি! এক ঘণ্টার প্রাণান্তকর চেষ্টার পর অবশেষে আমরা সেই পরিচিত ট্রেইলটা খুঁজে পেলাম।

চূড়ান্ত জেদ: জোত্লং এর শীর্ষে

আমি হাঁফ ছেড়ে বললাম, চলেন ভাই, এবার অন্তত ফিরি। সামিট আর লাগবে না। কিন্তু দলপতি দৃঢ় স্বরে বললেন, না, আমরা যখন এত কাছে এসেছি, তখন সামিটে যাবই। বম ভাষায় যাকে বলা হয় ‘জোত্লং’ বা মিজোদের পাহাড়, তার ৩,৩৫৩ ফুট উচ্চতার সেই দুর্গম চূড়া আমাদের ডাকছে। এই পাহাড়েরই অন্য নাম মোদক মুয়াল।

জোত্লং এর চূড়া।

৩,০০০ ফুটের ওপরের এই উচ্চতা থেকে মেঘের ওপার দেখা যায়। আরও চল্লিশ মিনিটের খাড়া আর পিচ্ছিল পথ। বৃষ্টির মধ্যে পিচ্ছিল বাঁশ আঁকড়ে ধরে আমরা এগোতে থাকলাম। অবশেষে যখন একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, “এটাই চূড়া”, তখন মনে হলো শরীরের সব বিষাদ ধুয়ে গেছে। 

পতাকা হাতে জোত্লং চূড়ায় আমি।

অন্ধকারের বিভীষিকা: এক মরণপণ অবতরণ

বিজয়োল্লাস শেষ হতেই আমাদের রক্ত হিম হয়ে গেল—চারপাশে তখন দ্রুত সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পাহাড়ের বুকে সন্ধ্যা মানেই এক নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। বর্ষায় জোত্লং যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, তা প্রমাণের আর কিছু বাকি ছিল না। আমাদের ফেরার পথটা হয়ে উঠল এক চূড়ান্ত বিভীষিকা।

টর্চের সরু আলোতে ট্রেইল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে পায়ের নিচের মাটি এতটাই পিচ্ছিল হয়ে গেছে যে এক পা এগোলে দু পা ছিটকে পেছনে চলে যাচ্ছি। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বারবার আমরা নিচের দিকে পিছলে যাচ্ছিলাম। গভীর খাদের কিনারে পড়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মরিয়া হয়ে ঝাঁপ দিয়ে কাদা মাখা বুনো বাঁশ আঁকড়ে ধরে নিজেদের আটকে রাখছিলাম।

এমন পথ ধরেই ফিরে আসি রাতের আঁধারে।

পাগুলো তখন ক্ষতবিক্ষত, নখ দিয়ে রক্ত ঝরছে, ব্যথায় শরীর যেন আর বইছে না। ঘুটঘুটে অন্ধকারের চাদরে মোড়া চারপাশ। আমাদের টর্চের আলো ম্লান হয়ে আসছে ব্যাটারির অভাবে। অন্ধকারের বুক চিরে আমরা অবিরাম এগিয়ে চলছি। খাড়া পাহাড় থেকে নামার সময় যখন টর্চের আলোতেও নিচে কিছু দেখা যাচ্ছিল না, তখন কেবল অনুমানের ওপর ভর করে এক এক করে মরণঝাঁপ দিচ্ছিলাম আমরা।

জীবন ফিরে পাওয়া: ১৫ ঘণ্টা পর লোকালয়ে

দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টার এক অতিমানবিক ও অকল্পনীয় লড়াই শেষে যখন আমরা পাহাড়ের পাদদেশে গ্রামের সীমানায় পৌঁছালাম, তখন আমাদের শরীর নিথর, কিন্তু প্রাণের স্পন্দন তখনো তীব্র। গ্রামের দূরবর্তী আলোগুলো যখন প্রথম নজরে এল, মনে হলো আমরা কোনো নতুন গ্রহে পা রেখেছি।

গ্রামে ঢোকার মুখেই আমাদের কানে এল মানুষের কোলাহল আর চোখে পড়ল অসংখ্য টর্চলাইটের আলোর নাচানাচি। গ্রামবাসীরা আমাদের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার উপক্রম করছিল। আমাদের সেই বিপর্যস্ত, রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তাদের চোখেও এক অসীম স্বস্তি ফুটে উঠল। তারা ভালো করেই জানত, এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আর রাতের অন্ধকারে জোত্লং থেকে ফিরে আসা প্রায় অলৌকিক।

ক্ষত-বিক্ষত পা।

খুব শীঘ্রই হয়তো এখানে পাকা রাস্তা হবে। শেষ হবে অরণ্যের বুক চিরে চলা আদিম বুনো পথ। স্থানীয়দের শেষ শিকারটাও শেষ হবে। আমরা আধুনিক হব, ব্যাঙের ছাতার মতো হয়তো পর্যটন কেন্দ্রও গড়ে উঠবে এখানে। কিন্তু এই যে প্রকৃতি মায়ের কান্না, এই যে মাদার ট্রিগুলোর নিভৃত প্রস্থান আর বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের নীরব হাহাকার—তা কি কোনো আধুনিক পর্যটন মেটাতে পারবে?

 

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার এই অনুভূতি আমাদের সারা জীবন মনে করিয়ে দেবে—পাহাড় যেমন রাজকীয় সুন্দর, তেমনই নিষ্ঠুর তার বিচার। প্রকৃতি আমাদের আজ প্রাণে বাঁচিয়ে দিলেও তার অসীম শক্তি আর আমাদের লোভের এক করুণ চিত্র আমাদের স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী করে দিয়ে গেল।

Categories

Latest Blogs

Tags

Spread the love

Md. Eanur Hossain

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *