Comments
বাবা: আমার স্বপ্নের সারথি

বাবার শেষ বিদায়

বাড়ির সামনে বেশ জটলা, একটা লাশবাহী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িকে ঘিরে সবাই জড়ো হয়েছেন। শেষ দেখা দেখতে এসেছেন সবাই। আগের দিনই আব্বা পৃথিবীতে তাঁর শেষনিশ্বাস ছেড়েছেন। এখন শান্তির শেষ ঘুমে। গাড়ি এসেছে রাত তিনটায়, তখন থেকে অপেক্ষা দাফনের। আগের রাত থেকেই আমি স্তব্ধ। যেখানে গলা ফাটিয়ে কাঁদার কথা, সেখানে গলা দিয়ে একটু আওয়াজও বের হয়নি।

 

সকাল হয়, বেলা বাড়ে, ভিড়ও বাড়ে। সাইকেলে করে হকার আসে পত্রিকা নিয়ে। বাড়ি সামনে একটা চেয়ারে বসা আমি। আমার ডানে-বাঁয়ে অনেক লোক। সামনে একটা সফেদাগাছ। আব্বা সকাল হলে তাঁর গল্প করার মানুষজনের সঙ্গে গাছটার নিচে চেয়ার পেতে বসতেন। হকার তাঁর হাতেই পত্রিকা দিয়ে যেতেন। বাড়িতে প্রথম আলোর প্রথম পাঠক ছিলেন আব্বা।

 

বাড়ির সামনে হকার এসে থমকে দাঁড়ালেন। অনেক বছর ধরেই তিনি পত্রিকা দিয়ে যান। সেই সূত্রে বাবার সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িটি দেখে তাঁর প্রশ্ন, ‘কী হইছে?’ আমার মুখ থেকে ‘আব্বা তো নাই’ শোনার পর তাঁর চোখ ছলছল করে উঠেছিল। আমার হাতে পত্রিকাটা দিয়ে দ্রুত বিদায় নিয়েছিলেন তিনি।

 

বাবার স্বপ্নে বেঁচে থাকি

আব্বা অনেক আগে থেকেই প্রথম আলো পড়তেন। আমি প্রথম আলোতে কর্মী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর আরও বেশি আনন্দ নিয়ে পড়তেন। এক বছর ধরে আমি প্রথম আলোতে কাজ করি। আব্বার শরীর ভালো যাচ্ছিল না। এরপরও নানা খবর রাখতেন। আমি পত্রিকায় ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করি। এসব বোনকে খুঁজে দিতে বলতেন। এরপর বসে বসে সেগুলো ইউটিউবে দেখতেন। মাঝেমধ্যে আমি মুঠোফোনে দেখাতাম। প্রায় দিনই রাত করে ফিরতাম। আমার না–ফেরা অব্দি জেগে থাকতেন। সারা দিন কী করলাম, সেটা শুনে ঘুমাতেন।

প্রথম আলোতে আমার ইন্টার্নের শেষ দিন। আব্বা তখনো অসুস্থ। মতি ভাইয়ের (আমাদের সম্পাদক মতিউর রহমান) রুমে আমাকে ডাকা হয়েছে

সাক্ষাৎকারের জন্য। সেদিন আমি একটু আগেভাগেই অফিসে গিয়েছিলাম। বিকেল পাঁচটায় আমাকে ডাকার কথা। আব্বাও অপেক্ষায় ছিলেন, কী হয় জানার জন্য।

সাক্ষাৎকার শেষে প্রথম কলটা তাঁকেই দিয়েছিলাম, ‘আব্বা, আমার স্বপ্নের চাকরিটা হয়ে গেছে।’ কী যে খুশি হয়েছিলেন! আমার চাকরি পাওয়ার খুশিতে অনেকটা চনমনে হয়ে উঠেছিলেন। আরও কিছুটা বাঁচার আকাঙ্ক্ষা হয়তো তৈরি হয়েছিল তাঁর।

 

বাবার অমর বাণী

 

ইন্টার্নের শেষ দিকে আমার হাতে পাঁচটা চাকরির অপশন। আমি আব্বাকে বললাম, ‘কোথায় কাজ করব? তুমি কী চাও?’ বললেন, ‘প্রথম আলো।’ প্রথম মাসের বেতন দিয়ে মাকে কানের দুল কিনে দিলাম। আব্বা বোনদের কল করে বলেছিলেন, ‘তোমার মা জিতে গেল।’ আমি বললাম, ‘তোমার কি হিংসা হচ্ছে?’ আব্বার কী হাসি! তাঁর কাছে এটাই ছিল প্রাপ্তি।

এর মধ্যে আব্বাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বললাম, ‘মসজিদে মিলাদের মিষ্টি কিনে দিয়ো।’ আব্বা জুমার নামাজের দিন মসজিদে মিষ্টি নিয়ে গেলেন। কিন্তু কাউকে বললেন না কিসের মিষ্টি। আমার চাচাতো ভাই আব্বার কাছে ‘কিসের মিষ্টি’ জানতে চাওয়ার পর আব্বা বলেছিলেন, ‘তোমার ভাই চাকরি পাইছে না প্রথম আলোতে।’ আমি তখন শুটিং–এ চট্টগ্রাম। ফিরে আসার পর ভাইয়েরা আমাকে এ গল্প শুনিয়েছিলেন।

‘দিন শেষে তুমি একা, শক্ত থেকো!’

— বাবা

আব্বা কখনো আমাকে সামনাসামনি প্রশংসা করেননি। যতটা ধাক্কা দিয়ে শক্ত বানানো যায়, সেটা করেছেন। আমাকে বলতেন, ‘তোমাকে আমি পাথর বানায়ে রেখে যাব।’

এই সময়ে এসে আমি আমূল পাল্টে গেছি। অনেক কিছুই বদলে গেছে। তাঁর যে আকাশচুম্বি স্বপ্ন ছিল, আমাকে নিয়ে তা ছুঁয়ে দেখতে হবে। বলে গিয়েছেন, ‘দিন শেষে তুমি একা, শক্ত থেকো!’

বাড়িতে প্রথম আলোর নিখাদ পাঠকটা আর নেই। প্রতিদিন পত্রিকার স্তূপ ভারী হয়, দীর্ঘশ্বাসও বাড়ে। তবু আমাকে পাথর হতে হবে।

Spread the love